লেখক শ্রীকান্ত পাত্র, বিশিষ্ট সাংবাদিক, ঘাটাল: ২০২৩ এ হুগলির আরামবাগে ঘোষণার পরই কার্যত ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের কাজ শুরু হয়ে যায়। দেবকে পাশে বসিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সেদিনের ঘোষণায় তৃণমূল নেতা কর্মীদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়। হওয়ারই কথা। বাম ব্যর্থতাকে পুঁজি করে বহু আলোচিত ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান রূপায়ণে কোমর বেঁধে নেমে পড়েন শাসকদলের নেতা কর্মীরা। আরামবাগে ঘোষণার পর সেচ দফতর থেকেও দ্রুত তৎপরতা শুর হয়ে যায়। তৎকালীন সেচমন্ত্রী পার্থ ভৌমিক দেবকে নিয়ে সেচ দফতরেই উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে মিটিংও করেন। তারপরই ২০২৪ সালের শুরুতেই ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের সমীক্ষার কাজও শুরু হয়। সেচমন্ত্রীকে চেয়ারম্যান করে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার জেলা শাসক ও সেচ দফতরের আধিকারিকদের নিয়ে একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেচ দফতরের দাবি জোর কদমে চলছে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান এর কাজ। গতকাল ২৩ ফেব্রুয়ারি সেচমন্ত্রী মানস ভূঁইয়া ঘাটালের টাউন হলে ৩০ তম মিটিং করলেন ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়ে। সেচ দফতরের তথ্য বলছে, ২০১৮ থেকে ২০২১ সময়কালে এই প্রকল্পের আওতায় ৩৪১.৩৯ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় পরবর্তী কাজগুলি ২০২৪-২৫ থেকে শুরু করে ২০২৬-২৭ এই তিন অর্থ বর্ষের মধ্যে শেষ করতে ১৫০০ কোটি টাকা ধার্য হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থ বর্ষের বাজেটে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এই ৫০০ কোটির মধ্যে ৩৪১.৩৯ কোটি টাকা ইতিমধ্যেই (২০১৮-২১) ব্যয় করা হয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী একাধিকবার ঘোষণা করেছেন। হাতে রইলো ১৬০ কোটি টাকার মতো। মনে রাখবেন এবার অন্তর্বর্তী বাজেটে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানে কোনও টাকা বরাদ্দ করা হয়নি। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস জিতে এলে নিশ্চয়ই বাকি ১০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হবে। এখন প্রশ্ন হলো, ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের ‘প্ল্যানটা’ কোথায়? তার মানে হলো ১৫০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প তার কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের শেষতম মিটিং গত ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ডি.পি.আর (ডিটেইলস প্রজেক্ট রিপোর্ট) প্রকাশ করতে পারেনি সেচ দফতর। কেন? একাধিকবার এই প্রশ্নে এড়িয়ে গেছেন সেচমন্ত্রী থেকে আধিকারিকরা। আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিই রাজ্যে পালাবদলের পর কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেসের জোট সরকারের প্রথম সেচমন্ত্রী ছিলেন বর্তমান সেচমন্ত্রী মানস ভূঁইয়া। সেচমন্ত্রী হয়েই ২০১১ সালের ৩০ জুলাই মানসবাবু ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়ে ঘাটাল মহকুমা শাসকের প্রগতি সভাকক্ষে ঘটা করে মিটিং করেছিলেন। সেই সভায় উপস্থিত সাংবাদিকদের ও আধিকারিকদের হাতে মাস্টার প্ল্যানের একটি করে ডি.পি.আর (সেচ দফতরের সিলমোহর দেওয়া) দিয়েছিলেন মানাসবাবু। তারপর ধামাচাপা পড়ে যায়। তারপর থেকে শিলাবতী নদী দিয়ে কয়েক কোটি কিউসেক জল গড়িয়ে যায়। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান হয়ে উঠে নির্বাচনী প্রচারের ট্রাম্প কার্ড। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে এই ট্রাম কার্ড খেলেন অভিনেতা দেব। ঘাটাল লোকসভা আসনে দাঁড়ালোনোর তাঁর প্রথম শর্ট ছিল ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান রূপায়ন। অভিনেতা দেবের চাপে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান রূপায়ণ করতে উদ্যোগী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনে ঘাটাল লোকসভা আসনে নির্বাচনী প্রচারের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান। প্রতি নির্বাচনী সভায় দেব ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান তুলে ধরেন। আমি বিশ্বাস করি দেব না চাপ দিলে আজও ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান আলোর মুখ দেখতে পেত না। কিন্তু ঘাটালের বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য যে মাস্টার প্ল্যানের কথা প্রচার করা হচ্ছে সেটা কি আদৌ বন্যা নিয়ন্ত্রণের মাস্টার প্ল্যান ? তাহলে তার ডি.পি.আর প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন? ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা করা হয়েছে। সেই মামলায় রাজ্য সরকার বা সেচ দফতর ডি.পি.আর জমা দিতে পারেনি। কেন ? বিরোধীরা তো বটেই সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধিদের প্রশ্নেও হয় চুপ থেকেছে বা এড়িয়ে গেছেন। কেন ? আরও মনে করিয়ে দিই, ২০১১ সালে ৩০ জুলাই মনসবাবু সাংবাদিকদের হাতে যে ডি.পি.আর তুলে দিয়েছিলেন সেটা তৈরী করা হয়েছিল বাম আমলে। ২০০৯ সালে কেন্দ্র সরকারের একটি সংস্থা ওয়াপক্সকে দিয়ে বামফ্রন্ট সরকারের সেচ দফতর ওই ডিপিআর তৈরী করায়। কিন্তু কিছু ত্রুটির উল্লেখ করে সেটি ফেরৎ পাঠায় কেন্দ্রের জল সম্পদ দফতর। ২০১১ সালে চূড়ান্ত হওয়ার আগেই বাম সরকারের পতন ঘটে। সেই সংশোধিত ডি.পি.আর ৩০ জুলাই সাংবাদিকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তুলে দিয়েছিলেন আজকের সেচমন্ত্রী মানস ভূঁইয়া। নতুন করে যে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নাম দিয়ে ঘাটালের বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে উদ্যোগী হয়েছে রাজ্য সেচ দফতর তার কোনও ডি.পি.আর নেই। থাকলে নিশ্চয়ই প্রকাশ করা হতো। ফলে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সন্দেহের দানা বাঁধছে।
এবার আসি একটি গুরুত্বপুর্ন বিষয়ে। দেশের আইন অনুযায়ী কোনো রাজ্য সরকার ও কেন্দ্র সরকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে উদ্যোগী হলে Ganga Flood Controll commissin এর অনুমোদন চাই বা ছাড়পত্র চাই। প্রশ্ন উঠেছে GFCC এর ছাড়পত্র পেয়ে কি আজকের ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান রূপায়ণ হচ্ছে ? গঙ্গা বন্যা নিয়ন্ত্রণ কমিশনের ছাড়পত্র পেতে হলে ডি.পি.আর জমা দিতেই হবে। এক্ষেত্রে কি সত্যিই ছাড়পত্র রয়েছে ? থাকলে প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন ? একই সরকার একই মন্ত্রী রয়েছেন। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়ে ৩০ বার মিটিং করলেন ম্যানসবাবু। কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই সেচ দফতরের। যে কাজগুলি এখন চলছে তাকে বলা যেতে পারে সেচ দফতরের রুটিন কাজ, রেগুলার ওয়ার্ক বলতে যা বোঝায়। শুধু তাই নয়, কথিত ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানে ১১ টি ব্লকের উল্লেখ থাকলেও মাত্র তিনটি ব্লকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ মাস্টার প্ল্যানের কাজ। এখনও পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি কী ? মনে রাখতে হবে, মুখ্যমন্ত্রী তথা সেচ দফতর মাস্টার প্ল্যানের ডেড লাইন বেঁধে দিয়েছে ২০২৭ সালের মার্চ মাস। সেচ দফতরের একটি সূত্র জানিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ১০ শতাংশের মতো কাজ এগিয়েছে। যা জানা গিয়েছে, ৩১ টি স্লুইস গেট এর মধ্যে মাত্র পাঁচটি গেটের কাজ শেষ হয়েছে। ৩৫ টি নদী ও খাল ড্রেনেজ এর মধ্যে পাঁচটির কাজ শুরু হয়েছে। মোট প্রায় ৫০০ কিলোমিটার নদী ও খাল ড্রেনেজ করা হবে। শোলাটোপা খাল ২০ শতাংশ, শীলাবতী নদী পাঁচ শতাংশ, তমাল নদী ২০ শতাংশ, পারাং নদী ১০ শতাংশ ও বুড়িগাং নদী ১০ শতাংশের মতো কাজ এগিয়েছে। আর বামণ বাঁধ যাকে সেচ দফতরের ভাষায় বলা হয় দোয়ার্ফ এমবঙ্কমেন্ট মোট ১১ টি হবে। মোট ৯২ কিলোমিটার। সেচ দফতর জানিয়েছে টেন্ডার প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে কাজগুলি। নতুন ১০৪ টি সেতুর মধ্যে পাঁচটি সেতুর কাজ শুরু হয়েছে দাসপুরে দুই নম্বর ব্লকে। ঘাটাল শহরে দুটি পাম্প হাউস নির্মাণের কাজ শুরু হয়েও থমকে আছে। কারণ সরকারি খাস জমিতে পাম্প হাউস তৈরী হলেও কয়েক একর জমি কিনতে হবে সেচ দফতরকে। তার টাকার ছাড়পত্র দেয়নি মন্ত্রিসভা। নদী ও খালগুলির পাড়ে এর হাজার হাজার গাছের ভবিষ্যৎ এখনও পুরোপুরি অন্ধকারে। দাসপুর এক নম্বর ব্লকের চন্দ্রেশ্বর খাল সম্প্রসারণ তো বিশ বাও জলে। কোথায় সাব কমিটি ? হাতে সময় মাত্র এক বছর। ডেড লাইন ২০২৭ সালের মার্চ। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের ভবিষ্যত অনেকটাই নির্ভর করছে সামনের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের উপর। তথাকথিত ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান এখনও পর্যন্ত অসম্পূর্ণ। চূড়ান্ত পরিকল্পনা না করেই চলছে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান এর কাজ ! বেশ মনে আছে প্রথম অবস্থায় চন্দ্রকোনা এক ও দুই নম্বর ব্লক ও কেশপুর ব্লক এই প্রকল্পে ছিল না। কেশপুরের বিধায়ক শিউলি সাহা ও চন্দ্রকোনা বিধায়ক অরূপ ধাড়ার দাবিতে সরব হতেই প্রকল্পে নাম ঢোকানো হয়। প্রথমে ঘাটালের ঝুমি নদী প্রকল্পে ছিল না। ঘাটালের নেতাদের দাবিতে ঝুমী নদীকে প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এমন ভুরি ভুরি অসঙ্গতি লক্ষ্য করা গিয়েছিল। শেষমেষ ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান না অশ্বডিম্ব প্রসব করে বসে !
বেচারা অভিনেতা সাংসদ দেব ! তাঁর একটাই ধ্যান জ্ঞান ঘাটালের মানুষকে বন্যার জল যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তি দিতে আন্তরিক চেষ্টা করেছেন। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়ে বিশদ কিছু জানেন বলে মনে হয় না। ৩০ বার মিটিং করে অগ্রগতি যেখানে মাত্র ১০ শতাংশ বাকি ৯০ শতাংশের কাজ শেষ করতে কত সময় লাগবে ? ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান ফ্লপ করলে তার সম্পূর্ণ দায় চাপবে দেবের ঘাড়ে। তার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে দেবকেই।